জেলেনস্কিকে ট্রাম্পের ‘চপেটাঘাত’, চুক্তির আগেই পণ্ড বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অভূতপূর্ব কাণ্ড দেখল বিশ্ব। ওয়াশিংটনে ডেকে নিয়ে জেলেনজস্কিকে চূড়ান্ত অপমান করেন ট্রাম্প ও দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি ‘অসম্মান’ দেখানোর অভিযোগে জেলেনস্কিকে বৈঠক ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। খবরটি নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এই ঘটনার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও কিয়েভ প্রশাসনের বিদ্যমান তিক্ততা আরও গাঢ় হবে বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত সহায়তার আশায় ওয়াশিংটনে এসেছিলেন জেলেনস্কি। সামরিক সহায়তা ও দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন চুক্তির বিনিময়ে দেশের খনিজসম্পদ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রকে দিতেও রাজি ছিলেন তিনি।
তবে প্রত্যাশার পুরোপুরি উল্টো ঘটে ওয়াশিংটনে। দ্বন্দ্বের জেরে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করার আগেই বৈঠক ভণ্ডুল হয়ে যায়।
এদিকে ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন ইউরোপের নেতারা। জার্মানির চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী ফ্রেডরিখ মেৎস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই ভয়ানক যুদ্ধে কে হামলাকারী আর কে ভুক্তভোগী- এ বিষয়টি আমাদের কাছে স্বচ্ছ থাকা জরুরি।’
বিতর্কিত এই বৈঠকের পরপরই ফোনকলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার সঙ্গে আলাপ করেন জেলেনস্কি।
উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে জেলেনস্কিসহ ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে আগামী রবিবার (২ মার্চ) আলোচনায় নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাজ্য। এই আলোচনায় প্রাধান্য পাবে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা।
আলোচনায় চরম উত্তেজনা
বৈঠকে উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের মন্তব্যে। ভ্যান্স এই দ্বন্দ্বের নিরসন ‘কূটনৈতিকভাবে’ করতে চান বলার পর জেলেনস্কি খোঁচার সুরেই জানান, ইউক্রেনে যে ধরনের পরিস্থিতি- এখানে কূটনীতি দিয়ে কাজ হবে না। একপর্যায়ে তিনি ভ্যান্সের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আপনি কী ধরনের কূটনীতির কথা বলছেন?’
জেলেনস্কির মন্তব্যকে ভালোভাবে নেননি ভ্যান্সও। জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনার দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য যে কূটনীতি দরকার- আমি সেই কূটনীতির প্রস্তাব রেখেছি।’
এতে ক্ষেপে গিয়ে ট্রাম্পের রুশপন্থি নীতির সমালোচনা করে জেলেনস্কি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচিত খুনির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যাওয়া।’
জেলেনস্কির মন্তব্যের জবাব ট্রাম্প দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথসোশ্যালে। এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকলে জেলেনস্কি শান্তিপূর্ণ অবস্থানে যাবেন না। তিনি কখনো ওই অবস্থানে পৌঁছাতে পারলে তখন আলোচনা করা যাবে।’
এ ছাড়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জেলেনস্কির সমালোচনা করে বলেন, ‘শুধু শান্তি চাই বললেই হবে না। এই যুদ্ধে যে ইউক্রেন হারছে, এটাও স্বীকার করে নিতে হবে। মিডিয়ার সামনে এসে পুতিনের বিরুদ্ধে টিপ্পনী না কেটে আদতেই শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।’
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আশা প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। এ সময় বিশ্ববাসীর কাছে পুরো পরিস্থিতির জন্য তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর প্রধান ওলেকসান্দ্র সিরিস্কি জানান, একতাই ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের ক্রান্তিকালে সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়াবে বলেও জানান তিনি।
এই পর্যায়ে ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের আচরণের কঠোর সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র পার্লামেন্টের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতারা। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ দেখা গেছে।
বিতণ্ডার একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বলেন, ‘আপনার হাতে এখন বেশি ক্ষমতা নেই। চাইলেই পাবেন না সবকিছু।’ উত্তরে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি ছেলেখেলা করছি না। বিষয়টির গভীরতা নিয়ে আমি অবগত।’
এ সময় খেপে গিয়ে জেলেনস্কি ও তার সঙ্গীদের আলোচনাসভা ত্যাগ করতে বলেন ট্রাম্প। জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের প্রতিনিধি দল বৈঠকে পুনরায় অংশগ্রহণ করতে চাইলেও ট্রাম্প রাজি হননি।
বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচিত খনিজ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়নি। দেশের খনিজসম্পদের বিনিময়ে হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শিবিরে টানার অভিপ্রায় মাঠে মারা গেছে।
এদিকে ইউরোপের নেতারা ট্রাম্পকে বিভিন্নভাবে ইউক্রেনের পক্ষে আনার চেষ্টা করলেও ক্ষিপ্ত ট্রাম্প বলেন, ‘ইউক্রেন হয় খনিজ চুক্তিতে সই করবে, নয়তো আমরা সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেব। এর পর কিয়েভ চাইলে একাই যুদ্ধ করতে পারে। আমার বিশ্বাস, ব্যাপারটা খুব একটা সুখকর হবে না।’
এ সময় হোয়াইট হাউসে বসে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে মন্তব্য করে ভ্যান্স জেলেনস্কিকে বলেন, ‘আপনি একবার ধন্যবাদও বললেন না।’
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা আদায় করে নিলেও ট্রাম্প-বাধার সামনে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন জেলেনস্কি।
এদিকে ট্রাম্পের ভাষ্য, তার মূল উদ্দেশ্য চলমান যুদ্ধের নিরসন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের লাগাম ধরা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশা করি পৃথিবী আমাকে শান্তির দূত হিসেবেই মনে রাখবে।’
ইউক্রেন দেশে অস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করলেও রুশ বাহিনী মোকাবিলা করতে ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশিরভাগই বিভিন্ন দেশের সহায়তায় পাওয়া। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পণ্ড হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে কিয়েভের। দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি
কমেন্ট বক্স